চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এলপিজি গ্যাস সংকট। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়ীরা। রান্নার চুলা বন্ধ, হোটেলে খাবার নেই, কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত—সব মিলিয়ে মিরসরাইজুড়ে চলছে মানুষের হাহাকার।
জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রুট ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং কোম্পানিগুলোর সরবরাহ সীমিত করার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যনির্ভর এলাকাগুলোতে, যার মধ্যে মিরসরাই অন্যতম।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার পর এখানে একের পর এক শিল্পকারখানা স্থাপনের পাশাপাশি দ্রুত বেড়েছে বসতবাড়ি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় পুরোপুরি এলপিজি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাহিদার বিপরীতে সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
গত ২০ ডিসেম্বর থেকে মিরসরাই উপজেলায় এলপিজি গ্যাসের এই তীব্র সংকট শুরু হয়। এতে উপজেলার প্রায় লাখ লাখ মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অধিকাংশ বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে গ্যাসনির্ভর মিল-কারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে অনিশ্চয়তায়। অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট তালা ঝুলিয়ে লোকসান গুনছেন মালিকরা।
উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বারইয়ারহাট, করেরহাট, শান্তিরহাট, আবুতোরাব বাজার, বড়তাকিয়া, মিরসরাই সদর, জোরারগঞ্জ, মিঠাছড়া ও নিজামপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে—বেশির ভাগ দোকানেই এলপিজি সিলিন্ডার নেই। কোথাও সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও স্বাভাবিক দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।
আবুতোরাব বাজারের এলপিজি খুচরা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষের মধ্যে হাহাকার চলছে। ক্ষুদ্র শিল্প, বসতবাড়ি ও হোটেল-রেস্টুরেন্ট সবই এলপিজি নির্ভর। আমাদের জানানো হয়েছে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ থাকায় এই সংকট।”
মিরসরাই বাজারের মক্কা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক রবিউল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “এভাবে সরবরাহ বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সরকার এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। হোটেল বন্ধ রেখে স্টাফদের বেতন দিতে হচ্ছে, মহাজনের কিস্তি দিতে হচ্ছে—দেউলিয়া হওয়া ছাড়া উপায় নেই।”
বারইয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান নয়ন বলেন, “বাসায় গ্যাস নেই, হোটেলও বন্ধ। বাজারে ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।”
বড়তাকিয়া বাজারের এক খাবার হোটেলের মালিক রিপন বলেন, “আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস না থাকায় দোকান প্রায় বন্ধ। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
মিরসরাই বিসিক শিল্প অঞ্চলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন এই সংকট চললে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গেলে খরচ বেড়ে যাবে, যা ছোট শিল্পগুলোর পক্ষে বহন করা কঠিন।
স্থানীয় বিএম গ্যাস ও যমুনা গ্যাসের ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই কম। মিঠাছড়া যমুনা গ্যাসের ডিলার আবুল হাসেম বলেন, “কোম্পানি থেকে নিয়মিত গ্যাস আসছে না। যা আসছে, তা মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।”
এদিকে একটি এলপিজি কোম্পানির প্রতিনিধি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহারে জটিলতা ও আমদানি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে এবং শিগগিরই গ্যাসের দাম বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন।
এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং কৃত্রিম সংকট রোধে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


